"লাইফটা হ্যাজ হয়ে গেল মাইরি!"


"কেন বস? দিব্যি খাচ্ছ দাচ্ছ বিনুনি দুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ। হ্যাজবার মতো তো কিস্যু দেখছি না?"


"বিনুনি তুলে কথা বলবি না শুভ, চুলটুল সব উঠে যাচ্ছে, ন্যাড়ামাথায় বিয়েতে বসতে হবে।"


"আরও ঘি-চপচপে পোলাও সাঁটা রোব্বার রোব্বার! শালা, আমি আর অপাই দুজনে মিলে অতগুলো আইবুড়োভাতের নেমন্তন্ন খাইনি, যত কটা তুই এখনই গিলেছিস।রোব্বার হলো কি পোলাও মাটন সাঁটাতে চললেন রানিসাহেবা! কুকুরের পেটে কি অত ঘি সয়?"


"আমায় কুকুর বলছিস? নিজের দিকে তাকা আগে। পেটটা দেখেছিস? তোর পেটে কাপ রেখে অপাই চা খেতে পারবে।"


"পারবে তো পারবে, যা ভাগ! আমার বউ, আমার যেখানে খুশি কাপ রেখে চা খাবে, তোর কী তাতে?"


"হি হি, জ্বলে গেছে!"


"মাতেঃ! ফিল্টার ইউজ করো এবার, আর একমাস সময় হাতে। শাশুড়ি দুটো কথা শোনালে তুমি যদি মুখ খুলে ফেলো, কী হবে ভাবছ?"


"আমার ভয় করছে শুভ।"


"তোর, ভয়? আজব বললি! আরে, তোকে বলাই হয়নি, পরশু অপাই কেস খেয়েছে।"


"কী হয়েছে?"


"মা অনেকক্ষণ ধরে ওকে বাসী কাপড় না কী ছাড়তে বলছিল, ও গা করছিল না। মা-ও একই রেকর্ড বাজিয়ে চলেছে, শেষে শুনি অপাই তেড়ে উঠেছে, 'বেকার ঘেনিও না তো বস্!' তারপর মুখচোখ লাল করে বিষম-টিষম খেয়ে যা তা কেস!"


"হি হি হি। অ্যাই শুভ, এই জায়গাটা বেশ, বল? একচিলতে সবুজটুকু আর এই বুড়ো বেঞ্চটা ভাগ্যিস এখনও আছে, আড্ডাগুলো নইলে কোথায় হতো? ক্যান্টিনে তো স্বপনদার কান খাড়া হয়েই আছে।"


"যা বলেছিস! শালা কান না ব্ল্যাকবক্স বোঝা যায় না।"


"কালকের প্রোগ্রামটায় এরকম একটা স্টেজ পাওয়া গেলে বেশ হতো, না রে? স্কিটটায় এরকম একটা সিনও আছে, জমে যেতো।"


"থাক বস, স্বপ্নে ঘি খেয়ে কাজ নেই আর। খিটকেল চৌধুরী মাল্লু কত ছেড়েছে জানো তো সবই, ওতে স্টেজ সাজানোর পয়সা ওঠে? শালা, অ্যানুয়াল ডে-র প্রোগ্রাম, বচ্ছরকার দিন, পয়সা দিচ্ছে টিপে টিপে, যেন ওই পয়সা মেরে আমি আমার বাড়ির দোতলা তুলছি। বদ্যিবুড়োর ফেয়ারওয়েলে একটা ভালো কিছু দিতে গেলে তোলা ফান্ডের পুরোটাই বেরিয়ে যাবে। এইভাবে প্রজেক্ট হয়?"


"বৈদ্যস্যার, দত্তস্যাররা কিন্তু রিহার্সালের সময় ইমোশনাল হয়ে পড়ছেন রোজই, কাল স্টেজে কান্নাকাটি শুরু হবে না তো?"


"হলে হবে! ফেয়ারওয়েলের দিন সবাই একটু-আধটু ইমোশনাল হয়, ঘ্যাঁঘাসুরকে দেখলি না, কেঁদে হেঁচে একসা হলো। কে বলবে দেখে, লোকটা সবাইকে দাবড়ে রাখতো! তুই আমিও হবো দেখিস।"


"তুই আমি এখান থেকেই রিটায়ার করব? হি হি! তারপর রোজ বিকেলে এসে এই বুড়ো বেঞ্চটায় বসে আড্ডা দেবো, হ্যাঁ?"


ভবিষ্যৎ চিন্তায় জল ঢালে শুভর ফোনের রিংটোন।


"এই শালা বদ্যিবুড়ো আর মিস করার সময় পায় না! রোজ ঠিক দুটো টান দেবো, আর মিস করতে শুরু করবে। দু'বছর ধরে শালা একই রুটিন, হেজে গেছি মাইরি। কাল থেকে ওর কেবিনে গিয়েই ধরাবো, কাউন্টার চাই কিনা শুধিয়ে নেবো। ভাল্লাগেনা আর!"


"কাল থেকে বৈদ্যস্যারকে পাবি কোথায়? স্যারের ফেয়ারওয়েল না কাল?"


"ওহহ, তাই তো! তাইই, না? হ্যাঁ, তাহলে? ইয়ে, মানে, পরশু থেকে বদ্যিবুড়োর কেবিন খালি? ভাল্লাগেনা মাইরি, চ তো দেখি, বুড়ো কেন ডাকছে?"


ওরা চলে গেল, যাওয়ার আগে শুভ পায়ে দ'লে নিভিয়ে গেল দু'টান দেওয়া আগুনটা। আর তখনই একফোঁটা দু'ফোঁটা করে ইলশেগুঁড়ি শুরু হয়ে গেল। শুভ আর তার বন্ধু দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে পড়লো অফিস বিল্ডিংয়ের মধ্যে, একচিলতে সবুজ জমিটায় একলা বসে রইলাম আমি। এই বৃষ্টিটা আজকাল আমার বেশ লাগে, একেবারে মিহি, শিলে বাটা পোস্তর মতো। হাসছ, ভাবছ শিলে বাটা পোস্ত আমি হাতে পেলাম কোথায়? কেন, ওই ওদের অফিসের বাইরের খোলার হোটেলের রমেশ ঠাকুর রোজ সকালে পোস্ত বেটে সেই হাতেই খৈনি ডলতে ডলতে আমার কাছে এসে দু'দন্ড বসে না বুঝি? হাত ধুয়ে আসে না, হাতে লেগে থাকা পোস্তবাটা আমার গায়ে লেগে যায় কখনও কখনও, তাই বুঝতে পারি কতটা মিহি, অনেকটা এই বৃষ্টিটার মতো। 


এখন অবশ্য আমি একা, আশেপাশে কেউ নেই। তাই কি? না না, ওই যে, একটা একলা শালিক, আনমনে বসে আছে আমার গায়ে, আহা, ওর বুঝি একটা ডানায় চোট আছে, তাই উড়ে যেতে পারেনি গাছের নিচে। কেমন ঝুপ্পুস হয়ে ভিজছে দ্যাখো! চলো, তোমরা সব এগিয়ে চলো বাড়ির পথে, বৃষ্টি ধরে এলো প্রায়, আমরা বরং এইখানেই থাকি। শেষ বিকেলের আলোমাখা ইলশেগুঁড়ি গায়ে মেখে ভিজতে থাকুক একলা শালিক, আর ভিজতে থাকি আমি, শ্যাওলাধরা রিটায়ার্ড একটা বুড়ো বেঞ্চ। 


(সমাপ্ত)